রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দখলে থাকা বহু ছাত্র ইউনিয়ন ও ক্যাম্পাসে এখন দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। একসময় যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলির কার্যকলাপ প্রায় ছিল না বললেই চলে, সেই জায়গাগুলিতেই এখন সক্রিয়ভাবে সংগঠন বিস্তার শুরু করেছে আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (#ABVP)।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কলেজ ক্যাম্পাসগুলিতে এবিভিপির একাধিক কর্মসূচি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সংগঠনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতির নামে জোর করে দখল, ভয় দেখানো ও একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে এবং বহু ক্যাম্পাস এখন “দখলমুক্ত” পরিবেশ ফিরে পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে জেলায় জেলায় সক্রিয় হয়েছে এবিভিপি নেতৃত্ব।
এবিভিপি নেতৃত্বের দাবি, এত দিন তারা ভিতরে ভিতরে সংগঠন বৃদ্ধির কাজ চালিয়ে গিয়েছে এবং ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন সমস্যা, দুর্নীতি, নিয়োগে অস্বচ্ছতা, শিক্ষাঙ্গনে হিংসা-সহ নানা ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা আরও প্রকাশ্যে সংগঠন বিস্তারের পাশাপাশি কলেজ ক্যাম্পাসে ভয়মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। সংগঠনের বক্তব্য, ছাত্রছাত্রীরা যাতে কোনও রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে ছাত্র রাজনীতিতে অংশ নিতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করাই এখন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
শনিবার সেই চিত্রই স্পষ্টভাবে ধরা পড়ল বর্ধমানে। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের পক্ষ থেকে বর্ধমান ডেন্টাল কলেজ (#BDC)-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময়, সাংগঠনিক আলোচনা এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথাবার্তা হয়। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন এবিভিপির বিভাগ প্রমুখ অনিরুদ্ধ বিশ্বাস, জেলা প্রমুখ অনুপম দত্ত, নগর প্রমুখ আশিস মজুমদার সহ সংগঠনের একাধিক কার্যকর্তা ও সমর্থক।
সংগঠনের নেতারা কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে শিক্ষাঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি, ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে মতামত বিনিময় করেন। এবিভিপি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীরা এখন “স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের পরিবেশ” ফিরে পাচ্ছেন এবং সেই কারণেই এবিভিপির প্রতি ছাত্রদের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে।
অন্যদিকে, একই দিনে বর্ধমান রাজ কলেজ (#BurdwanRajCollege)-এ এবিভিপির পক্ষ থেকে একটি পরিচয় বৈঠক ও সাংগঠনিক সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর অনুপম দত্ত ও অনিরুদ্ধ বিশ্বাস। সভায় কলেজের নতুন ও পুরনো ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী দিনের সাংগঠনিক কর্মসূচি, ছাত্রস্বার্থের আন্দোলন এবং শিক্ষাঙ্গনে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিদ্যার দেবী মা সরস্বতী ও স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ নিবেদন করেন উপস্থিত নেতৃত্ব ও ছাত্রছাত্রীরা। এরপর কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচয়পর্ব এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এবিভিপি নেতৃত্বের বক্তব্য, ছাত্রসমাজকে শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার পরিবেশ, চরিত্র গঠন এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করাও সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য।
এই সভায় বিশেষভাবে উপস্থিত ছিলেন বর্ধমান রাজ কলেজের প্রিন্সিপাল (ইনচার্জ) সহ কলেজের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যাপিকারা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন এবিভিপির নগর প্রেসিডেন্ট আশিস মজুমদার, নগর সেক্রেটারি সোহম বর্ধন, প্রাক্তন কার্যকর্তা এবং বর্তমান ছাত্র নেতৃত্ব। সভা ঘিরে কলেজ চত্বরে উৎসাহ দেখা যায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও।

এবিভিপি নেতৃত্বের দাবি, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কলেজ ক্যাম্পাসগুলিতে “গণতান্ত্রিক পরিবেশ” ফিরে এসেছে এবং সেই সুযোগেই তারা সংগঠনকে নতুনভাবে বিস্তার করার কাজ শুরু করেছে। আগামী দিনে জেলার আরও বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি, পরিচয় সভা, ছাত্র সমস্যা নিয়ে আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে এবিষয়ে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। যদিও রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রাজ্যের ছাত্র রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে এবং আগামী দিনে কলেজ ক্যাম্পাসগুলিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র হতে পারে।


