শ্রীমতী মায়াশী বন্দ্যোপাধ্যায় : জ্যোতিষ কি সত্যিই আমাদের ভাগ্য বদলাতে পারে? এই প্রশ্নটা হয়তো কমবেশি সকলের মনের মধ্যেই সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এর উত্তর জানার জন্য প্রথমেই আমাদের বোঝা দরকার ‘জ্যোতিষ শাস্ত্র’ আসলে কী? কীভাবে এটি কাজ করে দৈনন্দিন জীবনে? এবং আমাদের জীবনে জ্যোতিষের ভূমিকাই বা কী?
সংস্কৃত শব্দ ‘জ্যোতিষ’ এসেছে জ্যোতি বা আলো থেকে। সুতরাং, জ্যোতিষ শাস্ত্র হল জ্যোতি বা আলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিদ্যা। যা প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেখানে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও গতি মানুষের জীবন, ভাগ্য এবং ঘটনাবলীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। জ্যোতিষের মূল ভিত্তি পাওয়া যায় ঋগ্বেদে। যেখানে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে এটি ‘বেদাঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই শাস্ত্র প্রথমে ঋগ্বৈদিক যুগে ভারতবর্ষের মুনি-ঋষিরা যজ্ঞ ও পূজার সঠিক সময় নির্ধারণের জন্য ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে সেটি গ্রহের গতি ও গ্রহণের সময় নির্ণয় এবং জন্মকুণ্ডলীর মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎবাণী করার কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। জ্যোতিষশাস্ত্রের তিনটি শাখা— সিদ্ধান্ত, হোরা ও সংহিতা বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় আজও জ্যোতিষশাস্ত্র পারদর্শী হিসেবে খনা, বরাহমিহিরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
এবার আসা যাক জন্মকুণ্ডলীতে। জ্যোতিষের মূল উপাদান হল নবগ্রহ- সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু ও কেতু। রাশি বারটি। যথা- মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন। আর নক্ষত্র সাতাশটি। যা চন্দ্রের গতির উপর নির্ভরশীল। জাতক বা জাতিকার জন্মের মুহূর্তে আকাশে গ্রহগুলির যে অবস্থান থাকে, সেটাই মানুষের জীবনে নানাবিধ প্রভাব ফেলে। তাই জন্মের সময়, তারিখ ও স্থানের ভিত্তিতে তৈরি চিত্রকেই জন্মকুণ্ডলী বা জন্মছক বলা হয়। জন্মছকে বারটি ঘর থাকে। এই ঘরগুলি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র নির্দেশ করে এবং মানুষের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা দেয়। এর মূল লক্ষ্যই হল গণনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করা। এছাড়াও, ব্যক্তিত্ব, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া। অন্যদিকে, দশা বা গোচর আমাদের জীবনের নির্দিষ্ট সময়ের উত্থান বা পতন বুঝতে সাহায্য করে।
জীবন অনেক সময়ই অপ্রত্যাশিত ও জটিল। সেক্ষেত্রে একজন প্রকৃত জ্যোতিষশাস্ত্র বিশারদ-ই জন্মছক অনুযায়ী জাতক-জাতিকার জীবনে সঠিক পথ ও সঠিক সময় নির্ধারণ করতে পারেন। ভবিষ্যতে চলার পথকে আলোকিত করতে পারেন। কিন্তু কখনোই ভাগ্য বদলাতে পারেন না। সুতরাং, জ্যোতিষশাস্ত্র কোনও কুসংস্কার নয়। বরং, মানুষের জীবনের কণ্টকাকীর্ণ পথকে সুগম করতে জ্যোতিষ শাস্ত্র অপরিহার্য।


